|

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত: মোহর্রমের চাঁদ এল ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়। ওয়া হোসেনা ওয়া হোসেনা তারি মাতম শোনা যায়।।
কাঁদিয়া জয়নাল আবেদীন বেহোশ হ'ল কারবালায়। বেহেশতে লুটিয়া কাঁদে আলি ও মা ফাতেমায়।। .. কাঁদে বিশ্বের মুসলিম আজি, গাহে তারি মর্সিয়া। ঝরে হাজার বছর ধরে অশ্রূ তারি শোকে হায়।। ==০==
খাতুনে-জান্নাত ফাতেমা জননী বিশ্ব-দুলালী নবী-নন্দিনী।। মদিনা-বাসিনী পাপ-তাপ-নাশিনী উম্মত-তারিনী আনন্দিনী।। সাহারার বুকে মা গো তুমি মেঘ মায়া, ...তপ্ত মরুর প্রাণে স্নেহ-তরুছায়; মুক্তি লভিল মা গো তব শুভ পরশে বিশ্বের যত নারী বন্দিনী।। হাসান হোসেন তব উম্মত তরে, মা গো ! কারবালা-প্রান্তরে দিলে বলিদান; বদ্লাতে তার রোজ হাশরের দিনে চাহিবে মা মোর মতো পাপীদের ত্রাণ। ==০==
ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ্।.. তখতের লোভে এসেছে এজিদ কমবখতের বেশে !
এসেছে সীমার, এসেছে কুফা'র বিশ্বসঘাতকতা, ত্যাগের ধর্মে এসেছে লোভের প্রবল নির্মমতা !
মুসলিমে মুসলিমে আনিয়াছে বিদ্বেষের বিষাদ, ...কাঁদে আসমান জমিন, কাঁদিছে মোহর্রমের চাঁদ।
একদিকে মাতা ফাতেমার বীর দুলাল হোসেনী সেনা, আর দিকে যত তখত-বিলাসী লোভী এজিদের কেনা।..
এই ধুর্ত্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন, আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান !
এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায় হাসানে হোসেনে গালি দিতে যেত মক্কা ও মদিনায়।..
--জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম
নীলসিয়া আস্মান লালে লাল দুনিয়া,- ‘আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।’ কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে, সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে। রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া-দামেশ্কে- ‘জয়নালে পরালো এ খুনিয়ারা বেশ কে।’ ‘হায় হায় হোসেনা,’ ওঠে রোল ঝঞ্ঝায়। তল্ওয়ার কেঁপে ওঠে এজিদেরো পঞ্জায়। উন্মাদ দুল্দুল ছুটে ফেরে মদিনায়, আলি-জাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায়। মা ফাতিমা আস্মানে কাঁদে খুলি’ কেশপাশ, বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের শ্বেত বাস। রণে যায় কাশিম ঐ দু’ঘড়ির নওশা, মেহেদীর রঙটুকু মুছে গেল সহসা। হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা ‘কঙ্কন পঁইচি খুলে ফেল সকীনা।’ কাঁদে কে রে কোলে ক’রে কাসিমের কাটা-শির। খান খান খুন হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর। কেঁদে গেছে থামি’ হেথা মৃত্যু ও রুদ্র, বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র। গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা ‘আম্মা গো, পানি দাও, ফেটে গেল ছাতি, মা।’ নিয়ে তৃষা সাহারার দুনিয়ার হাহাকার, কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার! দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস, পানি আনে মুখে, হাঁকে দুষমনও ‘সাব্বাস্’! দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা, হাঁকে বীর, ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা!’ কলিজা কাবাব-সম ভুনে মরু-রোদ্দুর, খাঁ খাঁ করে কারবালা, নাই পানি খর্জুর। মা’র স্তনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়পায়, জিভ চুষে কচি জান থাকে কি রে ধড়টায়? দাউ দাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর, কাঁদে বানু- ‘পানি দাও, মরে জাদু আসগর!’ পেলো না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন, ডাকে মাতা,- ‘পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্!’ পুত্রহীনার আর বিধবার কাঁদনে ছিঁড়ে আনে মর্মের বত্রিশ বাঁধনে! তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল, ‘দাদা! তেরি ঘর কিয়া বরবাদ পয়মাল্!’ হাইদরী হাঁক হাঁকি’ দুলদুল-আসওয়ার শম্সের চম্কায় দুষমনে ত্রাসবার। খ’সে পড়ে হাত হ’তে শত্রুর তরবার, ভাসে চোখে কিয়ামতে আল্লার দরবার। নিঃশেষ দুষমন্; ও কে রণ-শ্রান্ত ফোরাতের নীরে নেমে’ মোছে আঁখি-প্রান্ত! কোথা বাবা আস্গর? শোকে বুক ঝাঁঝরা, পানি দেখে হোসেনের ফেটে যায় পাঁজরা! ধুঁকে ‘ম’লো, আহা, তবু পানি এক কাৎরা দেয়নি রে বাছাদের মুখে কম্জাতরা! অঞ্জলি হ’তে পানি পড়ে গেল র্ঝর্ঝ লুট ভূমে মহাবাহু খঞ্জর-জর্জর! হল্কুমে হানে তেগ ও কে বসে ছাতিতে?- আফ্তাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে। আস্মান ভরে গেল গোধূলিতে দুপুরে, লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে! বেটাদের লোহু-রাঙা পিরহান হাতে, আহ্- আরশের পায়া ধরে কাঁদে মাতা ফাতেমা, ‘এয়্ খোদা, বদলাতে বেটাদের রক্তের মার্জনা করো গোনা পাপী কম্বখতের’ কত মহররম এলো, গেল চলে বহু কাল- ভুলি নি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল। মুসলিম! তোরা আজ ‘জয়নাল আবেদীন’। ওয়া হোসেনা- ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন! ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা, ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবীর, দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির,- তবে শোন ওই শোন বাজে কোথা দামামা, শমশের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা।
|